Earthquake

ভূমিকম্প থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন কিভাবে? – জানা থাকলে বাঁচা সহজ || Invensef

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনওই আগাম বলে কয়ে আসে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কিন্তু আমাদের দেশে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষই ঠিক জানেন না এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, আর কোন কাজটি বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়।

এজন্যই, নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখতে আগেভাগে জেনে রাখা জরুরি—ভূমিকম্পের আগে, সময় এবং পরের মুহূর্তগুলোতে ঠিক কী করা উচিত।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস
অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের সঠিক সময়, স্থান বা মাত্রা বলতে পারেন। কিন্তু সত্য হলো — বিজ্ঞান আজও ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দিতে সক্ষম নয়।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ভূমিকম্পবিদ ড. স্টিফেন হিকস বলেন,
“ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আমরা অনুমান করতে পারি, তবে নির্দিষ্ট সময় বলা অসম্ভব।”

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা জাপানের মতো দেশে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল নির্ধারণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তুলনামূলক কার্যকর।

তাই সময় জানা না গেলেও প্রস্তুত থাকা-ই নিরাপত্তার মূল উপায়।

তৈরি থাকুন


যদিও ভূমিকম্প কখন আঘাত হানবে তা ভবিষ্যদ্বাণী করা সহজ নয়, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনাকে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে, অর্থাৎ ভূমিকম্প ঘটলে কী করতে হবে সে সম্পর্কে আপনার একটা পরিকল্পনা থাকা উচিত।

“আপনি যদি [ভূমিকম্প-প্রবণ] কোন এলাকায় থাকেন, তাহলে আপনার বাড়িতে একটি জরুরি প্যাক তৈরি রাখা ভালো,” বলেছেন ড. হিকস।

ভূমিকম্পের মুহূর্তে আতঙ্ক নয়, পরিকল্পনা জীবন বাঁচায়। তাই ঘরে একটি Emergency Kit তৈরি রাখা বিশেষ জরুরি। এতে থাকতে পারে—
• বিশুদ্ধ পানি
• শুকনো খাবার
• টর্চলাইট
• ফার্স্ট এইড কিট
• প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা
• নগদ কিছু অর্থ
• গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের কপি (জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রেসক্রিপশন ইত্যাদি)

এই সামান্য প্রস্তুতি বড় দুর্যোগের সময় প্রচুর ভরসা যোগায়।

Drop, Cover & Hold – নিয়মটি মনে রাখুন।


যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন, যদি বিল্ডিংটি নিরাপদ হয়।
ভূমিকম্প শুরু হলেই দৌড়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা অনেকেই করেন। কিন্তু এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে—

সর্বোচ্চ নিরাপদ পদ্ধতি হলো যেখানে আছেন সেখানেই থাকা।
১. Drop (বসে পড়ুন)
হাঁটু ভাঁজ করে নিচে বসুন। এতে ভারসাম্য থাকবে এবং পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।

২. Cover (আশ্রয় নিন)
• মাথা ও ঘাড় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে—হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
• কাছে থাকলে টেবিল, ডেস্ক বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন।

৩. Hold On (ভালভাবে ধরে থাকুন)
কাঁপুনি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয় আঁকড়ে ধরে রাখুন।
আগে মনে করা হতো দরজার ফ্রেম নিচে দাঁড়ালে নিরাপদ। কিন্তু আধুনিক বিল্ডিং কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে বিশেষজ্ঞরা এখন এই পদ্ধতি পরিহারের পরামর্শ দেন। তবে, আপনি যদি তুলনামূলকভাবে পুরানো বাড়িতে থাকেন তাহলে সবচেয়ে ভাল হবে টেবিলের নিচে আশ্রয় নেয়া।

জানালা এবং ভবনের সামনের অংশ প্রায়ই প্রথম ধসে পড়ে। তাই এসব বিপদজনক জায়গা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি সেখানেই থাকতে পারেন।

পরিস্থিতি নিরাপদ হলে বাইরে যাবেন


ঝাঁকুনি একেবারে থেমে যাওয়ার পর সাধারণত খোলা জায়গায় বের হওয়া নিরাপদ। কারণ আপনি যে বিল্ডিংয়ে থাকেন সেটিও ধসে পড়তে পারে।

ঝাঁকুনি পুরোপুরি শেষ হলে—
• শান্তভাবে খোলা জায়গায় বেরিয়ে যান
• নিজের ও আশেপাশের মানুষের অবস্থা যাচাই করুন
• গ্যাস বা আগুনের গন্ধ পেলে সাথে সাথে এলাকা খালি করুন
• ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফেরত যাওয়ার চেষ্টা করবেন না

কিন্তু আপনি যখন বাইরে থাকেন তখন যদি ভূমিকম্প হয়?

“যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন,” বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বিল্ডিং, বৈদ্যুতিক তার, ম্যান-হোল, জ্বালানি এবং গ্যাসের লাইন থেকে দূরে সরে গেলে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

গাছ, টেলিফোনের খুঁটি এবং বিল্ডিং থেকে দূরে খোলা জায়গায় চলে যাওয়াই ভাল, বলছেন তারা।

নিয়মিত মহড়া


ড. হিকস ভূমিকম্পের প্রস্তুতি হিসেবে নিয়মিত মহড়ার গুরুত্বের উপরও জোর দিচ্ছেন।

“কোন কোন দেশে ভূমিকম্পের মহড়ার প্রচলন রয়েছে, যেখানে সবাইকে কী করতে হবে তার প্র্যাকটিস করতে হয়। তবে তুরস্কের এই অংশে সম্ভবত তেমন কোনো প্রচলন ছিল না, কারণ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ভূমিকম্প হয়নি।”

বিপদ থেকে দূরে থাকুন


আর্থকোয়েক কান্ট্রি অ্যালায়েন্স সংস্থার মতে, টেলিভিশন, বাতি, কাঁচ এবং বইয়ের আলমারি পড়ে গিয়ে বা উড়ন্ত বস্তুর কারণে বেশিরভাগ আঘাত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে। এসব আঘাত এড়ানোর একটি উপায় হল ভারী আসবাবপত্রগুলোকে স্ট্র্যাপ দিয়ে পেছনের দেয়ালের সাথে আটকে রাখা।

আরেকটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হল ভূমিকম্পের পর ফেটে যাওয়া পাইপ থেকে গ্যাস বের হওয়া।

ড. হিকস ১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ভূমিকম্পের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, ঐ ঘটনায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।

“ভবনের ঝাঁকুনি কিংবা ভবন ধসে পড়ে নয়, অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটেছিল গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণের ফলে,” তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, আশেপাশের দাহ্য পদার্থ থেকে দূরে থাকুন।

ভূমিকম্পের সময় আতঙ্ক নয়, জ্ঞান ও প্রস্তুতিই জীবন রক্ষা করতে পারে।
আমরা ভূমিকম্প থামাতে পারি না, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের এবং পরিবারকে নিরাপদ রাখতে পারি।

নিজে জানুন, পরিবারকে জানান—
সচেতন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।

Invensef

#invensef
#earthquake
#earthquakeinbangladesh

Scroll to Top